আজ সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন

Logo
দেশে একজনও গৃহহীন থাকবে না, এটাই মুজিববর্ষের অঙ্গিকার: প্রধানমন্ত্রী

দেশে একজনও গৃহহীন থাকবে না, এটাই মুজিববর্ষের অঙ্গিকার: প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। আর এটাই হলো মুজিববর্ষের অঙ্গীকার। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত মুজিববর্ষে ৬৬ হাজারের বেশি গৃহহীন পরিবারের মাঝে ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী  আরো বলেন, আজকে সত্যি আমার জন্য একটি আনন্দের দিন। কারণ এই দেশের যারা সবথেকে বঞ্চিত মানুষ, যাদের কোন ঠিকানা ছিল না, ঘরবাড়ি নেই। আজকে তাদেরকে অন্তত একটা ঠিকানা, মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পেরেছি। এই দেশের মানুষের জন্যই কিন্তু আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। তিনিতো আমাদের কথা কখনো চিন্তা করেন নাই। সারাজীবন চিন্তা করেছেন এই দেশের মানুষের কথা।

সরকার প্রধান বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে তিনি (বঙ্গবন্ধু) মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। এই দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নানাভাবে সামাজিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দারিদ্রের কারণে ভিটেমাটি বিক্রি করে শূন্য হাতে রাস্তায় বের হয়। এইভাবে মানুষগুলো জীবনযাপন করে। তিনি স্বাধীনতার পরপরই গৃহহীন মানুষগুলোকে ঘর দেয়ার জন্য গুচ্ছগ্রাম পরিকল্পনা হাতে নেন। তিনি নোয়াখালীর চরাঞ্চলে গিয়ে গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করেন। সাধারণ মানুষের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করার চিন্তাটা তিনিই করেছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৮১ সালে মানুষের শক্তি নিয়েই আমি দেশে ফিরে আসি। আমার কিছু ছিলো না, ঘরও নাই, কোথা উঠবো তাও জানি না, কিভাবে চলবো তাও জানি না। কিন্তু তখন আমার মনে একটাই কথা ছিলো আমাকে যেতে হবে। কারণ হলো দেশের মানুষ সামরিক শাসকদের হাতে নিষ্পেষিত হচ্ছে, তাদেরকে মুক্তি দিতে হবে, অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে তার জন্য কাজ করতে হবে। এবং এই দেশের মানুষের ভাগ্যপরিবর্তন করতে হবে, যা আমার বাবা চেয়েছিলেন।

সেই আদর্শ সামনে নিয়েই আমি ফিরে আসি, কখনো আমি ছোট ফুফুর বাড়ি, মেঝ ফুফুর বাড়িতে দিন কাটাই। তখন আমার লক্ষ্য ছিলো একটাই আমি কিভাবে থাকবো সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু দেশের মানুষের কষ্ট দুঃখ হাহাকার কিভাবে দূর করবো সেই কাজ করবো।

বঙ্গবন্ধুকন্যা আরও বলেন, বাংলাদেশে বিদেশ থেকে প্রণোদনা নিয়ে সাহায্য করা হতো না। এরকম দুভার্গ্যে তারা পড়েছিল, এমনতো হওয়ার কথা ছিলো না। জাতির পিতাতো সব পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, গৃহহীনদের ঘর দিবেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল করে চিকিৎসা সেবা দিবেন। লেখাপড়ার ব্যবস্থা করবেন, মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন, এটাই ছিলো জাতির পিতার লক্ষ্য। তার পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন করতে পারতো তাহলে দেশের মানুষ আরও আগে উন্নত জীবন পেতো।

শতপ্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে নৌকার জয় হয়েছিল জনগণের আন্দোলনের ফসল হিসাবে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে আমাদের লক্ষ্য ছিলো দেশের খেটে খাওয়া, গরিব, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা এবং বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা। আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও স্বামী পরিত্যক্তদের ভাতা দেয়া শুরু করলাম।

গৃহহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্প নিলাম। কারণ তখন দেখা গিয়েছিল আলাদা ঘর দিলে সেটা বিক্রি করে দিতো, শূন্য হাতে ফিরে আসতো। সেই জন্য ব্যারাক করে দিয়ে প্রত্যেককে একটি ঘরের মালিক করে দিয়ে ভূমিহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর দেয়া শুরু করলাম। তারপর কমিউনিটি ক্লিনিক করে চিকিৎসা সেবা দৌড়গোড়ায় নেয়ার ব্যবস্থা করলাম। নিরক্ষর মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি। আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন জাতি গড়ে তোলার কাজ করলাম।

‘বস্তিবাসীদের মধ্যে যারা নিজের গ্রামে ফিরে যাবে, তাদের জন্য ঘরে ফেরার কর্মসূচি নিলাম। নিজ গ্রামে ফিরে গেলে ছয় মাস বিনা পয়সায় খাবার পাবে, বাচ্চাকে স্কুলে দিতে পারবে, বিনা পয়সায় একটা ঘর করে দেবো। সেই সাথে টাকা দেবো তারা যেন কাজ করে খেতে পারে। এর মাধ্যমে ঘরে ফেরা কর্মসূচি শুরু করলাম। গৃহায়ন তহবিল করি বাংলাদেশ ব্যাংকে। এই তহবিলের টাকা আমরা এনজিওদের মাধ্যমে দিলাম, তারা যেন আমাদের ভূমিহীন মানুষদের ঘর তৈরি করে দিতে পারে।

এক শতাংশ সার্ভিস চার্জে টাকা দিতাম, ৫ শতাংশের বেশি তারা সুদ নিতে পারবে না, স্যানেটারি পায়খানা তারা বিনা পয়সায় করে দিবে এই শর্তে এনজিওদের দিলাম, এই প্রক্রিয়ায় ২৮ হাজার পরিবার ঘর পেয়েছিল। ১১ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের বিল্ডিং তৈরি করেছিলাম, তার মধ্যে ৪ হাজার চালু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি এসে তা বন্ধ করে দিয়েছিল।

২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা একইসঙ্গে পালন করে যাচ্ছি। করোনাভাইরাসে সারাবিশ্ব স্থবির। আজকে আমরা ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলতে হচ্ছে। আমার খুব আকাঙ্খা ছিলো নিজের হাতে দাঁড়িয়ে জমির দলিল তুলে দেবো। কিন্তু সেটা পারলাম না। তারপরেও ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে বলে আজকে আমি আপনাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারছি।

মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না এমনটা জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, মুজিববর্ষে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি মানুষও গৃহহীন, ঠিকানাবিহীন ও গৃহহারা থাকবে না। হয়তো আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। তাই আমরা সীমিত আকারে করে দিচ্ছি। সমস্ত মানুষের জন্য ঠিকানা আমরা করে দেব। কারণ আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষ ঘরে থাকলে আমার বাবা, মা যে ত্যাগ শিকার করেছিলেন এই দেশের মানুষের জন্য তাতে তাদের আত্মা শান্তি পাবে। আজকে আমরা সবচেয়ে খুশি এত অল্প সময়ে এতগুলো মানুষকে ঠিকানা দিতে পারছি। এই শীতের মধ্যে এই সমস্ত মানুষ ঘরে থাকতে পারবে।

‘আমারা রিফিউজিদের ভাসানচরে ঘর করে দিচ্ছি। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার ক্ষমতার সময়ে ঘূর্ণিঝড়ে যে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেই কক্সবাজারে খুরশকুলে ঘর করে দিয়েছি। আরও ১০০টি বিল্ডিং তৈরি করে দেব। আজকে ৬৬ হাজার ১৮৯ ঘর তৈরি করে দিয়েছি। আরও ১ লাখ ঘর তৈরি করব।

মুজিববর্ষে আমাদের অনেক কর্মসূচি ছিলো কিন্তু করোনার কারণে তা করতে পারি নাই। করোনা আমাদের জন্য যেমন অভিশাপ নিয়ে এসেছিলো আবার আরেকদিকে আশির্বাদও। কারণ আমরা এই একটি প্রকল্পেই আমরা নজর দিতে পেরেছি। এটাই আমাদের আজকে বড় উৎসব গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষদের ঘর দিতে পেরেছি। এর চেয়ে বড় উৎসব বাংলাদেশে হতে পারে না। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বৃত্তশালীদের নিজ নিজ এলাকার ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর তৈরি করে দেয়ার আহ্বান করেন।

উদ্বোধন শেষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপকারভোগীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময় করেন সরকার প্রধান।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে ঘর পাওয়া পারভীন নামে এক নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করে এবং সুস্থতা কামনা করেন।

নিজের স্বামী নিয়মিত কাজ পায় না এবং খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটে জানিয়ে পারভীন ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আমার স্বামী কাজ পায় না। মাঝে মধ্যে না খেয়ে থাকতে হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। কোনদিন ভাবিনি ঘর হবে। আপনি আমাদের ঘর দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন। আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন। কয়েকটি বাক্য বলেই উপকারভোগী নারী কৃতজ্ঞতায় কাঁদতে থাকেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আপনি কাঁদবেন না। আমি মনে করি এটা আমার কর্তব্য। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির পিতা কন্যা হিসেবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো, এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার স্বপ্নপূরণ করবো। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে সেজন্য আমি আমার জীবনকে উৎসর্গ করেছি। বাংলাদেশে একটি মানুষও যেন গৃহহীন ও ভূমিহীন না থাকে আমি সেই ব্যবস্থা করবো। সেই সাথে আপনারা যেন আপনাদের জীবন-জীবিকার পথ খুঁজে পান সেই ব্যবস্থাও করব।

সারাদেশে যারা ঘর পেয়েছেন তাদের ঘরের সামনে একটি করে গাছ, বিশেষ করে ফলজ গাছ লাগানোর আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। নদী ভাঙনে যাতে আর কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মুজিববর্ষ ঘোষণা করে সরকার। মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না- এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আশ্রায়ন-২ প্রকল্পের অধীনে চলমান কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে আজ সারাদেশে ৬৯ হাজারের বেশি পরিবারকে ঘর ও খাস জমি দেয়া হয়। দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর করে দিতে এখন পর্যন্ত প্রায় নয় লাখ পরিবারকে তালিকাভূক্ত করেছে শেখ হাসিনা সরকার।

৬৯ হাজার ৯০৪ পরিবারের মধ্যে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে দুই শতাংশ খাস জমির মালিকানা দিয়ে বিনা পয়সায় দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একইসঙ্গে ব্যারাকের মাধ্যমে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪ প্রকল্পের মাধ্যমে তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এটিই বিশ্বে গৃহহীন মানুষকে বিনামূল্যে ঘর করে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে নতুন ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ।

দেশে ভূমিহীন ও গৃহহীন অসহায় মানুষদের মধ্যে যাদের ভূমি নেই তাদের সরকারের খাস জমি থেকে দুই শতাংশ ভিটে এবং ঘর দিচ্ছে সরকার। যাদের ভিটে আছে ঘর নেই তাদের ঘর দিচ্ছে সরকার। প্রতিটি ঘর দুই কক্ষ বিশিষ্ট। এতে দুটি রুম ছাড়াও সামনে একটি বারান্দা, একটি টয়লেট, একটি রান্নাঘর এবং একটি খোলা জায়গা থাকবে। পুরো ঘরটি নির্মাণের জন্য খরচ হবে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং মালামাল পরিবহনের জন্য চার হাজার টাকা দেওয়া হবে প্রতি পরিবারকে।

সূত্র-ঢাকাটাইমস


© স্বত্ব ২০২০ | About-US | Privacy-PolicyContact