আজ শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন

Logo
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা: ১০ জঙ্গির ফাঁসির আদেশ বহাল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা: ১০ জঙ্গির ফাঁসির আদেশ বহাল

অনলাইন ডেস্ক:

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় দুই দশক আগে সমাবেশস্থলে বোমা পেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় হরকাতুল জিহাদের ১০ জঙ্গির ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। এছাড়া ১৪ বছরের সাজা খাটা আসামি আনিসুলকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

বুধবার সকালে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। ভাষার মাসে বাংলা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ওয়াশিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই এবং মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর।এ ছাড়া মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান এবং সরোয়ার হোসেন মিয়াকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক বছরের দণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের বেঞ্চ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের শুনানি শেষে রায়ের দিন নির্ধারণ করেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ওদিন শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বশির উল্লাহ।

এছাড়া সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মিজানুর রহমান খান শাহিন, মোহাম্মদ শাহিন আহমেদ, মো. সাফায়েত জামিল, মো. আশিকুজ্জামান বাবু, সাদিয়া সুলতানা রত্নাও শুনানিতে অংশ নেন।

আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ আহসান, মো. নাসিরউদ্দিন। এছাড়া পলাতক আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন আমূল্য কুমার সরকার।

২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন মামলা দায়ের করেন। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই দিনই কোটালীপাড়া থানার পুলিশ হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করে।

পরবর্তীকালে ২০০৯ সালের ২৯ জুন আরো নয়জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য ঢাকা-২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়।

২০১৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ হরকাতুল জিহাদের দশ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একজনকে যাবজ্জীবন ও ৩ জনকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

গুলি করে প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন বিচারক। এছাড়া চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধ্বংস করতেই ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পঁচাত্তরে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর, ১৯৮১ সালে সভানেত্রী হয়ে আবারও একাত্তরের চেতনা পুনরুদ্ধারের লড়াই শুরু করেন তিনি। দেশের উন্নয়ন-ঐক্যের স্বার্থে তার নিরাপত্তায় আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, ক্ষমতা দখলকারীদের ষড়যন্ত্রে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। দেশে ফিরতে বাধা দেয়া হচ্ছিল তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ। সে বছরের ১৭ই মে দেশে ফেরেন তিনি।

শেখ হাসিনার প্রাণনাশে প্রথম আঘাতটি আসে ১৯৮৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। হামলা চালানো হয় ১৯৮৯ ও ১৯৯১ সালেও। চতুর্থ হামলাটি হয় ১৯৯৪-এ। ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে, তাকে বহনকারী ট্রেন লক্ষ্য করে ছোড়া হয় গুলি। পঞ্চম আঘাত ১৯৯৫ সালে। শেখ রাসেল স্কোয়ারে সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় গুলিবর্ষণ হলেও বেঁচে যান তিনি।

১৯৯৬ এর ৭ই মার্চ। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনা বক্তৃতা শেষ করার পরপরই একটি মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে চালানো হয় গুলি, ছোড়া হয় বোমা। ১৯৯৯ সালে, যখন দেশ চালাচ্ছেন শক্ত হাতে, তখন ফাস হয় তাকে হত্যার পরিকল্পনা।

২০০০ সালের ২০ জুলাই তাকে হত্যা করতে কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলের অদূরে পুঁতে রাখা হয়েছিল ৭৬ কেজি ওজনের বোমা। পরের বছর খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল শেখ হাসিনার। সেখানেও পাতা হয়েছিল বোমা। সে বছরই নির্বাচনী প্রচারের সময় সিলেটে তার জনসভা স্থলের কাছে একটি বাড়িতে হয় বিস্ফোরণ।

২০০২-এ বিরোধীদলীয় নেতা থাকা অবস্থায় নওগাঁয় হামলা হয় তার গাড়ি বহরে। সাতক্ষীরায় হামলা হয়েছিল সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে। ২০০৪ সালে বরিশালের গৌরনদীতে গুলি চালানো হয় তার গাড়ি বহরে।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হামলাটি বঙ্গবন্ধু কন্যার ওপর চালানো হয় ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট। সেই গ্রেনেড হামলায় নিহত হন ২৪ জন। আহত হন প্রায় ৬০০ নেতাকর্মী। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাসবিরোধী সে সমাবেশে রাষ্ট্রীয় মদদে হামলার প্রমাণও মিলেছে।

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ১৯৭৫ সালে যে উদ্দেশ্যে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল, সে নীলনকশা বাস্তবায়নেই শেখ হাসিনার ওপর হামলা হয়েছে বারবার।

এসব কারণেই শেখ হাসিনার নিরাপত্তার বিষয়টি আরো গুরুত্ব দিয়ে দেখার তাগিদও দিচ্ছেন বিশ্লেষক-ইতিহাসবিদেরা।

সূত্র-ইনডিপেনডেন্ট টিভি


© স্বত্ব ২০২০ | About-US | Privacy-PolicyContact