আজ শনিবার, ২৪ Jul ২০২১, ০৭:৩৩ অপরাহ্ন

Logo
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তাসনুভা

নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তাসনুভা

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশি ট্রান্সজেন্ডার তাসনুভা আনান শিশিরকে নিয়ে তোলপাড় শুধু বাংলাদেশই নয়। এর ঢেউ পৌঁছে গেছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রেও। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে তাকে নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করেছে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন।

ফলে রাতারাতি একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে তাসনুভার (২৯) নাম। তাকে নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, তাসনুভা বড় হয়েছেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের এক মুসলিম পরিবারে। নারীত্বসুলভ ব্যবহারের জন্য উদ্ভট লাগতো তাকে। তাকে অনেকেই মাঝেমাঝে মানসিকভাবে অসুস্থ বলতেন।

এ কারণে তিনি চারবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাহলো- ‘কে আমি?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার সংবাদ পাঠিকা। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি সাক্ষাৎকারে জীবনের এই জার্নি সম্পর্কে বলেছেন, আমি শারীরিকভাবে জন্মেছি একটি পুরুষের দেহ নিয়ে। কিন্তু মনে মনে সবসময়ই নারীদের আচরণ পোষণ করতাম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হবে।

তার এই দৃঢ় মনোবাসনা তাকে টেনে নিয়ে যায় ইন্টারনেটে। সেখানে সার্স করতে থাকেন। খুঁজতে থাকেন তার মতো আর কেউ আছেন কিনা। সংক্ষেপে তাকে মিস শিশির নামেই ডাকা হয়। জীবনের চলার পথে তাকে অনেক বেদনা সইতে হয়েছে। হয়রানির শিকার হয়েছেন। মৌখিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি তার পরিবারের সদস্যরাও তাকে নিন্দামন্দ করতেন। ফলে কপর্দকহীন শিশির বসবাস করতে থাকেন একটি বস্তিতে।

তারপর মার্চে মাত্র তিন মিনিটে তার জীবন পুরো পাল্টে গেছে। তাকে সংবাদ পাঠিকা হিসেবে সুযোগ দিয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন বৈশাখী টিভি। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রথম সেগমেন্টেই তিনি উপস্থিত হন। তার এই উপস্থিতি বাংলাদেশি লাখ লাখ মানুষ দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব সভায় চলে যায় তার নাম।

১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে এমন ট্রান্সজেন্ডার মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত জানা কঠিন। ২০১৩ সালে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রান্ডজেন্ডার মানুষদের তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরা জন্মে পুরুষ হিসেবে। কিন্তু আস্তে আস্তে তারা নারী হিসেবে পরিচিত হয়। এর মধ্য দিয়ে নেপাল ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। এর আগে ভারত যুক্ত হয় ২০১৪ সালে। ট্রান্সজেন্ডার এবং বহুলিঙ্গের মানুষ সবাইকে হিজড়া বলা হয় না।

ডিপার্টমেন্ট অব সোশ্যাল সার্ভিসেসের জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১০ হাজার স্বঘোষিত হিজড়া আছেন। তবে স্থানীয় বেসরকারি সংগঠন ‘সম্পর্কের নয়া সেতু বলেছে, হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষের সংখ্যা হতে পারে ৫ লাখ। তবে এর মধ্য থেকে মিস শিশিরকে পার্ট-টাইম সংবাদ উপস্থাপিকা হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় পরিস্থিতি বিবর্তিত হচ্ছে।

মিস শিশিরের জন্ম বাগেরহাটে। তার চারটি বোন ও দুটি ভাই আছে। মা একজন গৃহিনী। পিতা চিংড়ি ও লবণাক্ত পানির অন্যান্য মাছ বিক্রি করেন। অল্প বয়সেই মিস শিশির তার শরীরে ভিন্নতা লক্ষ্য করতে থাকেন। সিনেমা দেখতে দেখতে তিনি নিজেকে নায়িকা হিসেবে ভাবতে থাকেন। পরতে থাকে শাড়ি। বড়বোনের লিপস্টিক মাখতে থাকেন ঠোঁটে। অন্য মেয়েদের মতো তারও সাজতে ইচ্ছে করে। এক বোনের উৎসাহে তিনি যোগ দেন একটি নাচের স্কুলে।

কিন্তু পিতামাতা তা বন্ধ করে দেয়। এরপরেই এক টার্নিং পয়েন্ট আসে তার জীবনে। পারিবারিক এক পুরুষ সদস্য তাকে যৌন নির্যাতন করে। মিস শিশির বলেন, এতে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তখনও আমার বয়স ১০ বছর হয়নি। বিষয়টি অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারছিলাম না। মেয়েলি স্বভাবের কারণে পিতা তাকে নানা রকম কথা শোনান। মিস শিশির বলেন, এ সময়ে তাকে পরিবারের একটি অভিশাপ হিসেবে দেখা হতো।

পরিবার যখন আর্থিক বিষয় আশয় নিয়ে লড়াই করছে তখন তিনি ঘরের বাইরে আসতে পারতেন না। পিতা বললেন, যদি বাড়িতে থাকতে হয় তাহলে এই মেয়েলি স্বভাব ত্যাগ করতে হবে। এ সময় তিনি বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন তার বয়স ১৫ বছর। এই বয়সে বাড়ি ছাড়া খুব সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। মিস শিশির বলেন, এই বয়সে নিজের জীবনকে নিজে টেনে নেয়াটা অতো সহজ নয়।
বাড়ি ছেড়ে গেলেন তিনি। উঠলেন নারায়ণগঞ্জে এক আঙ্কেলের বাসায়। সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। তখনও তিনি একজন পুরুষ। সেখানেও তিনি একই রকম মৌখিক নির্যাতনের শিকার হন। এর উত্তর খুঁজতে ইন্টারনেটের আশ্রয় নেন। চূড়ান্তভাবে তিনি একটি শব্দ ট্রান্সজেন্ডার পেয়ে যান।

তখনও তিনি বাংলাদেশের ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের সঙ্গে তার সাক্ষাত হয়নি। তবে সীমান্তের বাইরে অনেককে খুঁজে পেলেন। মিস শিশির বলেন, বিষয়টি ছিল বিস্ময়কর। দেখলাম, আমি একাই নই। এই বিশ্বে আরো এমন মানুষ আছেন। আমাকে যেভাবে হয়রান এবং তিরস্কার করা হলো তাতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি কে। আমাকে একজন পুরুষের শরীরের ভিতর আটকে থাকলে হবে না। আমার ভিতর যে নারীত্বসুলভ মনোভাব জেগে উঠেছে তাকে লালন করতে হবে। আমার নারীত্বকে ভালবাসতে হবে।
এক পর্যায়ে তিনি ঢাকা চলে আসেন। কিছু বন্ধুর আর্থিক সহযোগিতা পান। কখনো কখনো তাদের বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন। অস্থায়ী কাজ পান। আস্তে আস্তে সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসে। উপার্জনের কোনো পথ না থাকায় এক পর্যায়ে তিনি ৬ মাস বস্তিতে থাকেন। সাত দিন তার কাছে কোনো খাবার ছিল না। কার্যত এ সময়ে তিনি অনাহারে থেকেছেন। আস্তে আস্তে সব পাল্টে যেতে থাকেন। তিনি ঢাকায় একজন ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। বিভিন্ন রকম চিকিৎসা দেন তিনি।

মিস শিশির বলেন, বছরের পর বছর আমি বৈষম্যের শিকার হয়েছি। চারবার আত্মহত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এরই মধ্যে এ বছর তাকে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক বললেন, বৈশাখী টিভিতে নতুন একটি প্রোডাকশন পরিকল্পনা চলছে। সেখানে আবেদন করতে পারেন শিশির। প্রথমে তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তাকে নির্বাচিত করা হয়। এ সম্পর্কে শিশির বলেছে, আমার মনে হচ্ছে ২০২১ সালটি আমার জন্য সৌভাগ্যের। এখন আমি এই দেশের একটি অংশ।


© স্বত্ব ২০২০ | About-US | Privacy-PolicyContact