আজ রবিবার, ২০ Jun ২০২১, ১০:৩০ অপরাহ্ন

Logo
সংবাদ শিরোনাম:
স্থায়ী আবাস পেল ৫৩ হাজার পরিবার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের উপ-নির্বাচন ও ৬টি ইউপির প্রতিটি কেন্দ্রই যাচ্ছে নির্বাচনী সামগ্রী লক্ষ্মীপুরে জেলেকে পিটিয়ে হত্যা, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার চেয়ে পরিবারের আকুতি বিএনপি এখন অস্তীত্বহীন,জনরায়কে ভয় পায় বলে নির্বাচনে আসেনা: জাহাঙ্গীর কবির নানক করোনা আরো ৫৪জনের মৃত্যু,শনাক্ত ৩৮৮৩ আলোচিত ইসলামি বক্তা ত্ব-হা ব্যক্তিগত কারণে আত্মগোপনে ছিলেন: পুলিশ জামিনে মুক্তি পেলেন নিপুণ রায় চৌধুরী লক্ষ্মীপুরের মতিরহাটে হচ্ছে নতুন লঞ্চঘাট লক্ষ্মীপুরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ৫শ ঘর উদ্বোধনের অপেক্ষায় জেলেকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, চেয়ারম্যানসহ ২৭জনকে আসামী করে মামলা
নির্বাচনী এলাকায় জনসমর্থনহীন,তবু কিভাবে এমপি হয়েছিলেন “অভিযুক্ত খুনি” আউয়াল?

নির্বাচনী এলাকায় জনসমর্থনহীন,তবু কিভাবে এমপি হয়েছিলেন “অভিযুক্ত খুনি” আউয়াল?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসনের সাবেক এমপি ও তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এমএ আউয়ালকে ঘিরে সাধারন মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এমএ আউয়াল নির্বাচনী এলাকায় জনসমর্থন না থাকলেও ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিভাবে এমপি হয়েছিলেন এখন জেলা ও উপজেলা জুড়ে সবার একই প্রশ্ন।

তখনও অভিযোগ ছিল, আউয়াল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে চাইনি। পাশাপাশি কেউ সাহস করে মুখ খুললেও টাকার বিনিময় ও হামলা মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানী করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।

এখন সবার মুখে মুখে একটি কথা, নির্বাচনী এলাকায় জনসমর্থনহীন ব্যাক্তি, কিভাবে এমপি হয়েছিলেন? আসলে এমএ আউয়াল এমপি নয়, তিনি হলেন একজন খুনি। তার দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবী করেন লক্ষ্মীপুর-রামগঞ্জ আসনের সাধারন মানুষ।

এ দিকে রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে ২৭৪-লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসন থেকে আওয়ামীলীগের কোন নেতা সরাসরি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হতে পারেন নি। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব ও হ্যাভেলি গ্রুপের চেয়ারম্যান লায়ন এম এ আউয়াল এ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে মহাজোট থেকে নির্বাচিত হন।

কিন্তু নির্বাচনের সময় আওয়ামীলীগের একটি বিশাল অংশ ও বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এম এ আউয়ালের চরম বিরোধীতা করে। এ আসনে তরিকতের এক পাসেন্ট ভোটও নেই। তিনি ছিলেন সমর্থনহীন ব্যাক্তি। তার কোন সমর্থন ছিল না বলে দাবী করেন অনেকেই।
অপরদিকে খুনের মামলায় এম এ আউয়াল গ্রেপ্তারের পর তার অনুসারীদের মাঝেও বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ৫জানুয়ারীর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের টিকিটে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হওয়ায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরাও বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শ^শুরবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় লক্ষ্মীপুর-১ রামগঞ্জ আসনের সাবেক এমপি এমএ আউয়ালকে। রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে বাবাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক এ সাংসদ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা দেয়া ক্রীয়া-প্রতিক্রিয়া। অনুসারীদের অনেকেই দিয়েছেন গাÑঢাকা। কেউ বা ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ফেইসবুকে। কেউ কেউ এম এ আউয়ালের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা বা গ্রেফতারে বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, আগামী নির্বাচনে তাকে (এম এ আউয়াল) অযোগ্য ঘোষণা করতেই হীন স্বার্থ চরিতার্থ করেছেন একটি মহল। হত্যাকা-ের সাথে সম্পৃক্ত ও গ্রেফতারে মোটা অংকের টাকা লগ্নি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার অনুসারীগণ।
নির্বাচনের দিন লায়ন এম এ আউয়ালের নিজ গ্রাম ৪নম্বর ইছাপুর ইউনিয়নের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে চলে ব্যপক সংঘর্ষ ও কেন্দ্রে আগুন দেয়ার ঘটনা। পুরো উপজেলাজুড়ে চলে তা-ব। নির্বাচনের সরকারী কাজে বাঁধা প্রদান, ভোট কেন্দ্রে আগুন দেয়া ও পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা হয় ৩৪টি মামলা।

উক্ত মামলায় আসামীর সংখ্যা ছিলো প্রায় অর্ধলক্ষ। প্রতিটি মামলায় আসামী করা হয় একই নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। একেকজনের বিরুদ্ধে রয়েছে ডজনখানেক মামলা। পানিয়ালার একটি ভোট কেন্দ্রে আগুন দেয়ার ঘটনায় মারা যান এক পুলিশ সদস্য।

ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যাক্তি নিজের ফেইসবুক আইডিতে লিখেন, লক্ষ্মীপুর জেলার ৪টি আসনে ভাড়াটিয়া হাইব্রিড এমপি চাইনা। হাইব্রিড নেতা ও এমপির কারনে জেলার মানসম্মান ধুলায় মিশেছে। আগামীতে মাঠের ও তৃনমূল নেতাকর্মীদের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই।
শিক্ষাবিদ জেডএম ফারুকী নিজের ফেইসবুকে আক্ষেপ করে লিখেন, লক্ষ্মীপুরবাসীর গৌরব ও অহংকার সাবেক এ সাংসদ। আমাদের দূর্ভাগ্য সাংসদ একজন খুনি এবং খুনের মদদদাতা। এ ধরনের কর্মকান্ডে আমরা বিব্রত ও লজ্জিত। এইভাবে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করেছেন।

লক্ষ¥ীপুর-১ আসনের সাবেক এমপি এম এ আউয়ালের স্থানীয় প্রতিনিধি ও ঘনিষ্টজন মো: মিজানুর রহমান বলেন, এমপি আউয়াল সাহেব খুনের মামলায় কিভাবে জড়িত হয়েছেন, সেটা সন্দেহজনক। আমরা উক্ত ঘটনায় বিব্রত। ব্যবসায়ীকভাবে তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে কিনা, সে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবী জানান তিনি।

এসময় তিনি আরো জানান, রামগঞ্জ উপজেলায় এম এ আউয়ালের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পাওয়া যাবে না। আগামী নির্বাচনে তার জোর সম্ভাবনা ছিলো মনোনয়ন প্রাপ্তির। আমি মনে করি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। তাকে ফাঁসানো হয়েছে।

ভাদুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি জাহিদ হোসেন ভুইয়া, কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাছির উদ্দিনসহ কয়েকজন চেয়ারম্যান জানান, এম এ আউয়ালের সহকারিগণ মানুষের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে বিনামূল্যের সরকারি ঘর, টি-আর, কাবিখা, কাবিটা, চল্লিশ দিনের কর্মসংস্থান, বিদ্যুত, সৌর বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, কালভাট, গভীর নলকুপসহ বিভিন্ন প্রকল্প দেয়ার কথা বলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, ঐ সব প্রকল্পের কারনে আমাদেরকে অনেক বিপাকে পড়তে হয়েছে।

কারন, অনেকে টাকা দিয়ে প্রকল্পের সুবিধা পাননি আবার অনেকে টাকাও ফেরৎ পায়নি। আউয়ালের সহকারিরা এসব অনিয়ম করে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুদুকের মাধ্যমে তদন্ত করে এদেরকেও আইনের আওতায় আনার দাবী জানান চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন ভূইয়াসহ অনেকেই।
উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের এক নেতা নাম প্রকাশ করার শর্তে জানান, রামগঞ্জ পৌরসভার সোনাপুর ৪৫ নম্বর মৌজায় ১৪শত ও ১৪শত ০৩ এবং ১৪শত ০৭ নম্বর দাগে হিন্দু ধর্মালম্বী সোনাপুর নাফিত বাড়ির মুক্তিযোদ্ধা হারাধন চন্দ্র শীলের ১৭ শতাংশ মূল্যবান জমি দখল করেন।

হারাধন চন্দ্র শীল মারা যাওয়ার পর তার কোনও ওয়ারিশ না থাকায় আউয়ালের নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে সুকৌশলে হারাধন চন্দ্র শীলের দূর সম্পর্কের মামাতো ভাই নারায়ণপুর শীল বাড়ির রাধারাম শীলকে ওয়ারিশ সাজিয়ে রেজিষ্ট্রি ওই জমি দখলে নেন।

উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আ.ক.ম রুহুল আমিন জানান, আমাদের দূর্ভাগ্য যে অত্র আসনে বর্তমান সাংসদ ড. আনোয়ার হোসেন খাঁন ছাড়া কোন আওয়ামীলীগ নেতা জাতীয় সংসদের সদস্য হতে পারেননি। ২০১৪ইং সনে হটাৎ করেই কোন এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তরিকত নেতা এম এ আউয়ালকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আমরা বাধ্য, তার নির্বাচন করতে।

সে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দলের বহু নেতা বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন। অর্ধশত ভোটকেন্দ্র ভাংচুর ও আগুন দিয়ে সরকারী সম্পদ জ¦ালিয়ে দেয়া হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মারুফ ভূইয়া জানান, উক্ত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এম এ আউয়ালের প্রধান শত্রু ছিলো আওয়ামীলীগ। তারাই চায়নি এম এ আউয়াল নির্বাচিত হোক। আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ভোট কেন্দ্রে হামলা ও আগুন দিয়েছে দাবী করে তিনি আরো জানান, উক্ত নির্বাচনে বিএনপিকে নিশ্চিন্ন করতে বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। উক্ত মামলাগুলোতে আসামীর সংখ্যা প্রায় ৫০হাজার।

আর একেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৮/১০টি মামলা। উক্ত মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে দিতে আমরা সর্বস্ব হারিয়েছি। অনেকেই বাড়ী ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ কেউ মামলা মাথায় নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। আল্লাহপাক তার উচিৎ শিক্ষা দিয়েছেন এম এ আউয়ালকে।
উল্লেখ্য ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে তরিকত ফেডারেশনের হয়ে সংসদ সদস্য হন এমএ আউয়াল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে দলীয় গঠনতন্ত্রের ২৪ এর উপধারামতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নিয়ম বহির্ভূত কর্মকান্ডের কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
সাবেক এমপি এ এ আউয়াল তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব। ২০১৮ সালের নভেম্বরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে পরের বছর ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।


© স্বত্ব ২০২০ | About-US | Privacy-PolicyContact